সেনবাগের সংস্কৃতিতে মেলা
॥ আরমানে আরছালান আরমান ॥
ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায়, তৎকালীন সময়ে সমাজের মানুষের আনন্দ উল্লাসের জন্য জমিদার, তালুকদারগণ তাদের বৈঠকখানার সামনে বিশেষ কোন দিন বা সময়কে উপলক্ষ করে ঢাকঢোল পিটিয়ে মেলার আয়োজন করতেন। তাঁর এলাকার প্রজাসাধারণ ঐ মেলাতে আনন্দ উল্লাস করতেন। তাছাড়া মুসলিম পীর মুরশীদগণ ওরস ও মেলার আয়োজন করে থাকেন। এরই আলোকে আমার প্রিয় জন্মভূমি সেনবাগ উপজেলার খ্যাতনামা মেলাসমূহের সন্ধানমূলক বিবরণ উপস্থাপন করলাম।
নলদিয়া দরগাঃ
স্থানীয় প্রবীণ মুরব্বিগণের সাথে আলোচনায় জানা যায়, আজ থেকে প্রায় একশ বছর পূর্বে নলদিয়া গ্রামে একজন দরবেশের মাজার শরিফ ছিল। ঐ মাজারে বার্ষিক ইছালে ছওয়াবকে কেন্দ্র করে এই বিখ্যাত নলদিয়া মেলার উৎপত্তি। পরবর্তীতে ক্রমান্বয়ে মেলার পরিধি বৃদ্ধি পায়। সেনবাগ, দাগনভূঞা, কোম্পানীগঞ্জ এই তিন থানার মিলিত বর্ডার এলাকায় নলদিয়া দরগার অবস্থান হওয়ায় অতিদ্রুত ঘটে তার বিস্তৃতি। নলদিয়া দরগা মেলা কাঠশিল্পের জন্য বিখ্যাত। বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গা হতে নামকরা কাঠের ফার্নিচার প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানসমূহ দরগাতে তাদের নিপুণ হাতের তৈরি কারুকাজের ফার্নিচার নিয়ে স্টল বসাতেন। সার্কাস, যাত্রা, টকী প্রদর্শন ছিল এই দরগা-মেলার বিশেষ আকর্ষণ। আজও প্রতি বছর মাঘ মাসের ১ তারিখ হতে ১০ তারিখ পর্যন্ত ১০ দিনব্যাপী নলদিয়া মেলা অনুষ্ঠিত হয়।
আমতলী মেলাঃ
পাকিস্তান আমলের প্রথম দিকে ৫নং ইউনিয়নের অর্জুনতলা গ্রামের মকবুল আহম্মদ চৌধুরী যখন ডিস্ট্রিক কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হন তখন তিনি তাঁর বাড়ির সামনে জমিতে একটি কৃষি মেলার আয়োজন করেন। মেলার পাশে বিশাল আকারের একটি আমগাছ ছিল বিধায় মেলার নামকরণ করা হয় আমতলী কৃষি প্রদশনী মেলা। বিজ্ঞজনদের মুখ থেকে জানা যায়, আশ্চর্য ধরনের কৃষিজাত পণ্য কৃষকেরা মেলায় নিয়ে আসতেন। সেগুলো থেকে বাছাই করে সেরা পণ্যের জন্য চাষী নির্বাচিত হতেন। তাদের মাঝে কৃষি অফিসার ও ডিস্ট্রিক বোর্ডের চেয়ারম্যান কর্তৃক তাদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হতো। এছাড়াও ঘোড় দৌড়, বায়োস্কোপ, পুতুল নাচ ছিল এই মেলার বিশেষ আকর্ষণ। বর্তমানে মাঘ মাসের ৫-১০ তারিখ পাঁচ দিনব্যাপী এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়।
সেবার হাট বৈশাখী মেলাঃ
জনৈক ব্যক্তির সাথে আলোচনায় জানা যায়, সেবার হাটের গোড়াপত্তনের আগে ঐ এলাকার সেবা ঠাকুরানী নামে এক বিশিষ্ট হিন্দু মহিলা বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করে এ মেলার আয়োজন করেন। তাঁর নাম অনুসারে নামকরণ করা হয় সেবার হাট। এ মেলা মূলতঃ হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নিয়ে পরিচালিত হয়। বাংলা নববর্ষকে ঘিরে তাদের এই মেলায় সন্দেশ, বাতাসা, মোয়া, দোভাজা, তোকমাই শরবত বিক্রি হতো। স্থানীয় কুমার সম্প্রদায়ের হাতে তৈরি মাটির হাঁড়ি-পাতিল, বাসন-কোসন ইত্যাদি এ মেলার উল্লেখযোগ্য আকর্ষণ ছিল। বর্তমানে বাংলা নববর্ষকে ঘিরে ১লা বৈশাখে এই মেলা প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয়।
দরগা বাড়ির মেলাঃ
৬নং কাবিলপুর ইউনিয়নের শায়েস্তানগর গ্রামে একজন বুজুর্গের দরগাকে কেন্দ্র করে এ মেলা চালু হয়। প্রথম প্রথম এই মেলা তেমন জমজমাট না হলেও স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তা বড় আকারে রূপ নেয় এবং ক্রমান্বয়ে ছমিরমুন্সির বাজার কমিটির সহায়তায় বাজারের নিকটতম স্থানে এ মেলার আয়োজন করা হয়।
দ- খোলা মেলাঃ
কাবিলপুর গ্রামে বসু মিঞার নিজস্ব উদ্যোগে তাঁর বাড়ির দক্ষিণ পাশের সেচ প্রকল্পের মাঠে এই মেলা বসত। প্রতি বছর শীতকালে একদিনের জন্য এ মেলা বসত। প্রায় একশ বছর আগ থেকে দ- খোলার মেলার উৎপত্তি। বর্তমানে আয়োজকের অভাবে মেলাটি বন্ধ রয়েছে।
লেমুয়া মেলাঃ
সেনবাগ থানার লেমুয়া গ্রামে এ মেলা বসে। এটি মৌসুমী মেলা হিসেবে পরিচিত। প্রতি বছর জানুয়ারি মাসে তিনদিনব্যাপী এই মেলার আয়োজন করা হয়। যতদূর জানা যায়, ৫০ বছর আগে লেমুয়া মেলার উৎপত্তি। এই মেলায় মৌসুমী ভাপা পিঠা, আংগুলভাজা, জিলাপি ছাড়াও মৌসুমী নানান পণ্যের জন্য প্রসিদ্ধ।
খনন আলী দরবেশের মেলাঃ
তথ্য সংগ্রহে জানা যায়, উত্তর শাহাপুর গ্রামের গণশাজলাতে মাটির একটি উঁচু স্তূপ ছিল। মানুষ তা খনন করতে বা কাটতে গেলে তা থেকে রক্ত প্রবাহিত হতো ও তারা নানান অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত হয়ে পড়তো এবং দুঃস্বপ্ন দেখত। তাই মানুষ মনে করত মাটির স্তূপে কোন পীর বুজুর্গ লোক রয়েছেন। পরবর্তীতে পূর্ব কাবিলপুর গ্রামে আলী আজ্জম নামে এক লোক স্বপ্নে দেখেন, তিনি সেখানে মেলা আয়োজন করছেন। সে থেকে তিনি ঐ স্থানে লালসালু কাপড় টাঙ্গিয়ে মেলার আয়োজন করেন। তখন থেকে শীতের সময়ে এ মেলা বসে। এই মেলা আলী দরবেশের মেলা নামে পরিচিত।
কইছা মেলাঃ
কল্যান্দি রামেন্দ্র মডেল হাই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা রামেন্দ্র সাহা তার অধীনস্থ প্রজাদের খাজনা আদায়ের বার্ষিক হালখাতা উপলক্ষে তার বাড়ির বৈঠকখানা (স্থানীয় সাহাজির বাজারে) এই মেলার আয়োজন করেন। নামকরণের শুদ্ধতা জানা হয় নাই। মেলাটি হিন্দুয়ানী কায়দায় উদযাপিত হতো। রামেন্দ্র সাহার মৃত্যুর পরে পরিচালনার অভাবে তা বন্ধ হয়ে যায়।
ঠাকুর মেলাঃ
কল্যান্দি বাজারের দক্ষিণে দক্ষিণ সাহাপুর গ্রামে ঠাকুর বাড়ির মন্দিরে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতি বছরের ৪ঠা বৈশাখে এই মেলার আয়োজন করা হয়। এ মেলা মূলতঃ হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নিয়ে পরিচালিত হয়। বাংলা নববর্ষকে ঘিরে তাদের এই মেলায় সন্দেশ, বাতাসা, জিলাপি, মোয়া, দোভাজা, আংগুল ভাজা, তোকমাই শরবত বিক্রি হতো। স্থানীয় কুমার সম্প্রদায়ের হাতে তৈরি মাটির হাঁড়ি-পাতিল, বাসন-কোসন ইত্যাদি এ মেলার উল্লেখযোগ্য উপকরণ ছিল। বর্তমানে বাংলা নববর্ষকে ঘিরে ৪ঠা বৈশাখে বৈশাখী মেলা হিসেবে এই মেলা প্রতি বছর আয়োজিত হয়।
বৈশাখী মেলাঃ
ছাতারপাইয়া হাই স্কুল মাঠে প্রতি বছর ১লা বৈশাখে এ মেলার আয়োজন করা হয়। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে এ মেলায় বাঙালি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ওপর বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ সুরে মুখরিত করে তোলে মেলার প্রাঙ্গণ।
এছাড়া সেনবাগে আরো অনেক মেলা আছে যে-সবের তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। উল্লেখিত মেলা-দরগাসমূহ আধুনিকতার ছোঁয়ায় সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতি ও অসাধু লোকদের কর্তৃত্বের কারণে প্রাচীন ঐতিহ্য হারানোর পথে। অনেক মেলা এখন আর বসেও না। আশা করি আমার এই ক্ষুদ্র লেখনীর মাধ্যমে এ সমস্ত মেলা-দরগা আবার পুনরুজ্জীবিত হবে।